
“মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ পড়বে এবং প্রবৃদ্ধি কমে যাবে।” আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ সিলভানা টেনরেইরো এ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, “অর্থনীতি এতদিন সহনশীল ছিল, কিন্তু সেই সহনশীলতা এখন সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।”
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা উপলক্ষে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা এ সপ্তাহে জড়ো হয়েছেন। মঙ্গলবার সেখানে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে আইএমএফ সতর্ক করেছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বিশ্বের অর্থনৈতিক বিজয়ী ও বিজিতদের মধ্যকার ব্যবধান আরও গভীর করছে।
প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক না হলেও আপাতত স্থিতিশীল। তবে সংস্থাটির মতে, এই গড় হিসাব “বিভিন্ন অর্থনীতির মধ্যে প্রবৃদ্ধির পুনর্বণ্টন” আড়াল করে রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রে চলতি ও আগামী বছর প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ করে। ইউরো ব্যবহারকারী দেশগুলোতে তা এর প্রায় অর্ধেক। ব্রিটেনের অবস্থাও খুব ভালো নয়। সেখানে চলতি বছর প্রবৃদ্ধি হবে আনুমানিক ১ দশমিক ৩ শতাংশ, আগামী বছর তার চেয়ে সামান্য কম।
জ্বালানি ও তেলের উচ্চমূল্য পরিবারগুলোর বিল পরিশোধের সামর্থ্যে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। আইএমএফ জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি চলতি বছর বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াবে, আগামী বছর তা ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
গরিব দেশ সবচেয়ে ঝুঁকিতে
যেসব দেশ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশ, তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং যাদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতামূলক খাত নেই, তাদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক অভিঘাতের কারণে দেশগুলোর মধ্যে এবং দেশের ভেতরেও আয়বৈষম্য বাড়তে পারে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
একের পর এক অভিঘাত
ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং সহযোগিতাভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভাঙন ধনী-গরিব সব দেশকেই অস্থির করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারগুলোর হাতে পরিস্থিতি সামলানোর সীমিত সুযোগই রয়েছে।
ফ্রান্সে জীর্ণ স্কুল ও কম বেতনের শিক্ষকদের নিয়ে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। এর শেকড় রয়েছে বড় অর্থনৈতিক সমস্যায়: বিশাল সরকারি ঋণ, উচ্চ ঋণব্যয়, জ্বালানির চড়া দাম ও রাজনৈতিক অসন্তোষ।
অনিশ্চয়তাই এখন মূল শব্দ। মধ্যপ্রাচ্যে সমাধানের লক্ষণ নেই। গত সপ্তাহান্তে সৌদি আরবে হুথিদের হামলা ও ইয়েমেনে বিমান হামলায় সহিংসতা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও পড়ছে। এ গ্রীষ্মে তীব্র তাপ ও খরায় সরবরাহ শৃঙ্খল ও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এল নিনোর ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কয়েক লাখ কোটি ডলার কমে যেতে পারে।
সাইবার হামলাও আস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের জন্য হুমকি। এ সপ্তাহে ফ্রান্সের সুপারমার্কেটে হ্যাকাররা হামলা চালিয়ে ফ্রিজের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জল্পনা চরম দুই প্রান্তে ছড়িয়েছে। কেউ বলছেন উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা বহুগুণ বাড়বে, কেউ আশঙ্কা করছেন বেশির ভাগ চাকরি, এমনকি মানবজাতিই বিলীন হতে পারে।
সহায়তায় সতর্কতা
আইএমএফ স্বীকার করেছে, বাড়তি দামের বোঝা কমাতে পরিবার ও ব্যবসাকে সহায়তা দেওয়ার চাপ সরকারগুলোর ওপর থাকবে। তবে সংস্থাটির অর্থনীতিবিদেরা কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন, ঋণ যখন আকাশছোঁয়া এবং ঋণব্যয় উচ্চ, তখন অতিরিক্ত ব্যয় ঠিক হবে না। তাঁদের পরামর্শ, সহায়তা হতে হবে সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক।

