
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে দেশীয় টায়ার শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানিকৃত নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির টায়ারের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে স্থানীয় টায়ার-টিউব উৎপাদনকারীদের দুটি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে খাতসংশ্লিষ্ট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
এমটিএফ টায়ারের নির্মাতা মেঘনা ইনোভা রাবার কোম্পানি লিমিটেডের সেলস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, আমদানিতে চড়া শুল্ক দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ সৃষ্টি করবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ মহলের প্রশ্ন হলো — কেবল শুল্ক বাড়িয়ে কি সত্যিকারের শিল্প রক্ষা সম্ভব?
সংশ্লিষ্টরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশীয় টায়ার শিল্পের প্রায় সব কাঁচামালই আমদানিনির্ভর এবং সেই কাঁচামালে বড় ধরনের শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিদেশি বড় টায়ার প্রস্তুতকারকরা বিভিন্ন সময় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেও শুল্ক ফাঁকি ও অব্যবস্থাপনার কারণে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছেন।
তুলনামূলক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। প্রতিবেশী ভারত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টায়ার রপ্তানি থেকে ৩.০৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টায়ার কোম্পানিগুলো সেখানে উৎপাদন করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে — কারণ শুল্ক সুরক্ষার পাশাপাশি সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। গার্মেন্টসহ একাধিক খাতে বিশাল রপ্তানি বাজার গড়ে তোলা বাংলাদেশে কেন টায়ার শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না — সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ভোক্তা ও পরিবহন খাতে উদ্বেগ স্পষ্ট। চট্টগ্রাম টায়ার টিউব ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটর্স গ্রুপের সভাপতি আলহাজ্ব মাইন উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি চলে চাকার ওপর, আর চাকার জন্য টায়ার প্রয়োজন। হুট করে টায়ারের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির ওপরই তার প্রভাব পড়বে।’
বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার গুডস ট্রান্সপোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকেই পরিবহন খাত চাপে রয়েছে এবং পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে। তার মতে, এর ওপর টায়ারের দাম আরও বাড়লে সেই চাপ তীব্রতর হবে এবং মূল্যস্ফীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে।
শুল্ক নির্ধারণে অসঙ্গতির অভিযোগও উঠেছে। সংগঠনটির সহসভাপতি মোহাম্মদ মুক্তার হোসেন জানান, প্রতি কেজি ২.৫ ডলারে আনা টায়ারের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ধরা হচ্ছে ৩ ডলার। ফলে ৩ হাজার ১০০ টাকা মূল্যের একটি টায়ারের বিপরীতে শুল্ক দিতে হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা।
উল্লেখ্য, বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্কএনটেল অ্যাডভাইজরসের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের টায়ার বাজারের আকার ২৩০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যার তিন-চতুর্থাংশই আসে খুচরা বাজার থেকে। অথচ দেশের বার্ষিক টায়ার চাহিদার ৯০ শতাংশই এখনো আমদানিনির্ভর। এই বাস্তবতায় শুধু শুল্কের দেয়াল তুলে দিলেই শিল্প গড়ে উঠবে কিনা — সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে জরুরি।

