
চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। চট্টগ্রামের সেই স্কুলবেলার ক্লাসরুম, টিফিনের ঘণ্টা, খেলার মাঠের হইচই — সবকিছু এখন শুধুই স্মৃতি। কিন্তু সেই স্মৃতির সুতো ছিঁড়ে যায়নি। সাগর পাড়ি দিয়ে, মহাদেশ পেরিয়ে আজও সেই বন্ধুত্ব টিকে আছে, বরং নতুন এক রূপ নিয়েছে — মানবসেবার ব্রত হয়ে।
১৯৮২ সালের চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলের এসএসসি ব্যাচের বন্ধুরা যখন কোভিড মহামারীর সেই দুঃসহ দিনগুলোতে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেননি যে সেই সংহতি একদিন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে। কিন্তু আজ MHSC-82 নামের এই সংগঠন শুধু পুরনো বন্ধুদের মিলনস্থল নয় — এটি হয়ে উঠেছে মানবতার এক জীবন্ত দলিল।

চট্টগ্রাম কিডনি হাসপাতালে দান করা দুটি ডায়ালাইসিস মেশিনে আজ অসচ্ছল রোগীরা প্রায় বিনামূল্যে বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া অসুস্থ বন্ধুদের সেবা কার্যক্রম সহ বন্ধুদের সন্তানদের লেখাপড়া কিংবা বিয়েশাদিতে এগিয়ে আসা হাতগুলো বলে দেয়, ৬০ ছুঁইছুঁই বয়সেও তাদের হৃদয় এখনো সেই কিশোরবেলার মতোই উদার।
শনিবার ২৭ জুন সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের সিরাজী ক্যাফেতে যখন বন্ধুরা একে একে এসে মিলিত হচ্ছিলেন, তখন চোখে চোখে যে ভাষা বিনিময় হয়েছিল, তা কোনো শব্দে বলা যায় না। চার দশক আগের সহপাঠী, আজ ভিন্ন ভিন্ন পেশা, ভিন্ন শহর, ভিন্ন দেশের ঠিকানায় থিতু হলেও — সেই পুরনো ডাকনাম, সেই খুনসুটি, সেই অমলিন হাসি ফিরে এসেছিল নিমেষেই। রাতভর লং আইল্যান্ডে ডাক্তার আতাউল ওসমানীর বাসভবনে চলেছে আড্ডা, স্মৃতিচারণ আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা — যেখানে শুধু আনন্দ নয়, ছিল দায়িত্ববোধও।

রোববার সকালের নাস্তা, ফটোসেশন আর কুইজ প্রতিযোগিতার হাসিঠাট্টার মধ্য দিয়ে যখন অনুষ্ঠান শেষ হলো, তখন অনেকের চোখেই ছিল বিদায়ের করুণ ছায়া। কারণ জানা নেই, পরের মিলন কবে হবে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত — নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া, নিউজার্সি, বোস্টন কানেকটিকাট থেকে শুরু করে সুদূর বাংলাদেশ , ইউরোপ, কানাডা , যুক্তরাজ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এই বন্ধুত্ব আর কখনো হারিয়ে যাবে না। কারণ ৬০ বছর বয়সেও তারা প্রমাণ করেছেন — প্রকৃত বন্ধুত্বের কোনো সীমান্ত নেই, কোনো বয়স নেই।
ক্রাইসিস ফান্ড গঠনের যে উদ্যোগ তারা নিয়েছেন, তা শুধু নিজেদের জন্য নয় — এটি একটি বার্তা, যে বন্ধুত্ব মানে শুধু স্মৃতিচারণ নয়, পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতিও।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে ৮২ ব্যাচের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডাক্তার আতাউল ওসমানী, ইমতিয়াজ হোসেন, হাবিবুর চৌধুরী, আনোয়ার আলম ভুট্টু, মুসা শরীফ, পান্না দিদার, মোহাম্মদ চৌধুরী মুন্নু, শাহেদ আলী খান, নান্নু চৌধুরী, ফারুক আহমেদ, মোহাম্মদ বাতেন, মোহাম্মদ ইস্কান্দার, সোলেমান চৌধুরী, হাবিব উল্লাহ ও মাহবুব রশীদ দিদার। ডিনার অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টুটুল, মোরশেদ, ডাক্তার রফিক ও আসিফ।

