আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে চাপে পড়তে যাচ্ছে বিএনপি। তবে এই ঘোষণায় আত্মশুদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট তকমার বিশাল বোঝা মাথায় নিয়েছে ৭৬ বছরের পুরনো দল আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে। ছাত্র জনতা নেতৃত্বের নতুন প্রজন্মের তরুণদের অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয়ার কারণে হাসিনা সরকার পালিয়ে যাওয়ায় দেশে সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সৃষ্টি হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মুল নেতৃত্বে আসনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামাত সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল সরাসরি না থাকায় অভ্যুত্থানের পরবর্তী প্রক্ষাপটে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র জন্ম হয়েছে। তবে নতুন এই রাজনৈতিক দল এনসিপি’র ভোটের মাঠে বড় শক্তি হয়ে উঠার সম্ভাবনা না থাকলেও হাজার-হাজার ছাত্রদের মাঝে তাদের রয়েছে ব্যাপক প্রভাব।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভোটের মাঠে বিএনপি এখন ক্ষমতার প্রথম দাবিদার। সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের মতো সক্রিয় সাংগঠনিক কার্যক্রম সেভাবে না থাকলেও বিএনপির রয়েছে বিশাল সমর্থক ও কর্মী বাহিনী।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল গঠন ও তার কন্যা শেখ হাসিনার ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়া বিষয়গুলে নিয়ে দেশে এখন বইছে আওয়ামী লীগ বিরোধী নেতিবাচক প্রচারণা। অন্যদিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা, সততা এবং তার সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়ার ধারাবাহিক আপসহীন ব্যক্তিত্বের বিষয়গুলো অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভিন্ন প্রচারণার বিএনপি এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
তবে বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও দীর্ঘ কারাবাসসহ বার্ধক্য জনিত অসুস্থতার কারণে তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় নেই। অন্যদিকে গত ৭বছর বিএনপিকে সুসংগঠিত রেখে দলের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তাতে তিনি এখন দলের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছেন। তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকেও দীর্ঘ সময় ধরে লন্ডনে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে।
মূলত তারেক রহমান ২০০১ সাল থেকে বিএনপি’র ক্ষমতা থাকাকালীন সময়ে সারাদেশে মাঠ পর্যায়ের প্রতিনিধি সম্মেলনের মাধ্যমে তৃণমূলের নেতা কর্মীদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তখনকার তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে তারেক রহমানের ছিল একচ্ছত্র প্রভাব। যার কারণে ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দিনের এক-এগারোর সরকার শত চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভাঙতে পারেনি। মূলত ২৪ বছর আগের সেই তরুনেরা এখন বিএনপির মূল নেতৃত্বে চলে এসেছেন। এবং যার কারণে গত ১৫ বছর লন্ডন থেকে তারেক রহমান সহজে দল পরিচালনা করতে পেরেছে।
তবে গত সতের বছর বিএনপিও তার অঙ্গ সংগঠনে সংযুক্ত হওয়া পরবর্তী প্রজন্মের তরুণরা সরাসরি তারেক রহমানের সংস্পর্শে যেতে পারেনি। তারেক রহমানও স্বশরীরের তৃণমূলে যেতে না পারায় তার সাথে বিশাল এই তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা শূন্যতা সৃষ্টির সম্ভাবনা থেকেই যাবে। এই শূন্যতা দূর করতে তারেক রহমানকে আরো অনেক দিন মাঠে পর্যায়ের সক্রিয় রাজনীতি করতে হতে পারে।
সামনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিহীন খালি মাঠে কিছু আসন ছাড়া বিএনপির তেমন কোন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই । তবে ভোটের মাঠে ৫০/৬০টি আসনে বিএনপির বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হলোও সেটা সরকার গঠনে তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না। এনসিপি, ইসলামী বিভিন্ন দলসহ জুলাই আন্দোলনের সহযোগী দল গুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ব্যক্তি বিশেষের নির্দিষ্ট এলাকায় জনপ্রিতা থাকলেও তারা সবাই মিলে ২০/৩০ বেশি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিএনপি যদি জাতীয় সরকার কিংবা অন্যদের আসন ছেড়ে না দেয় তবে জুলাই আন্দোলনের অন্য সহযোগী সবাই মিলে একশ আসনে নির্বাচিত হয়ে আসাটা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। তবে দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ জেলা ভিত্তিক স্বতন্ত্র ভাবে বেশ কিছু আসন পেলেও বিএনপিকে ক্ষমতা যাওয়ার পথে তেমন কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবেনা।
এদিকে গত ১৭ বছরের দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে রাজপথে থাকায় বিএনপিতে ব্যাপকভাবে তরুণ নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়েছে। তাই এবারের ভোটের মাঠে বিএনপির বেশিরভাগ নতুন প্রার্থীদের দেখা যেতে পারে । পুরানো পরীক্ষিত সিনিয়র নেতাদের অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে। আর বাকি যারা আছেন তাদের অনেকেই বার্ধক্য পৌঁছে গেছে। সেইজন্য বেশিরভাগ তরুণ প্রার্থীদের বিএনপিতে দেখা যেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসবে তা রাজনৈতিক মহলের সবাই অনুধাবন করছে।
এছাড়া আগামী নির্বাচনে বিএনপির টিকিট পেলেই বিজয় অনেকটাই সুনিশ্চিত বলে অনেকই মনে করছে। যার করণে বেশিরভাগ আসনে বিএনপির একাধিক তরুণ নেতা মনোনয়ন পাওয়ার দাবিদার হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় খালি মাঠে সংসদের যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার বিএনপিতে মনোনয়ন প্রত্যাশিদের মধ্য কোন্দল বাড়ছে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বিএনপিতে মনোনয়ন কেন্দ্রিক গ্রুপিং অসহণীয় পর্যায়ে চলে যাবে বলে অনেক আশঙ্কা করছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকার আধিপত্য নিয়ে বিএনপির দলীয় কোন্দলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮ জন কর্মী নিহত হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনে জয় নিশ্চিত হওয়ার পেক্ষাপটে নির্বাচনে দলীয় একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন চাওয়া নিয়ে বিএনপি কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছে। যেমনটি গত ভোটার বিহীন নির্বাচন গুলোতে একই অবস্থায় মধ্য পড়তে হয়েছিল আওয়ামী লীগকে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই দলীয় কোন্দলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট তকমা মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সম্পূর্ন স্থবির হয়ে পড়েছে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় দেশের অভ্যন্তরে। জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন তদন্তে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাসহ ঊর্ধ্বতন নেতার বিরুদ্ধে গণহত্যা,গুমসহ বিপুল অর্থ পাচারের মত চরম নেতিবাচক প্রচারণা জনগণের মন থেকে মুছে ফেলার মত কোন নেতৃত্ব এই মুহূর্তে দলে সক্রিয় নেই। তাছাড়া গত ৮ মাসে ভারত ছাড়া বিশ্বের কোন শক্তিশালী দেশ থেকে আওয়ামী লীগ তেমন কোন সহানুভূতি পায়নি। তার উপর দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশে অবস্থান করা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন চরম বিপদে। এই মুহূর্তে দেশে এমন কোন নেতা নেই যার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ গোপনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
অন্যদিকে গত ১৫ বছর ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে দেশে এবং দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক কার্যক্রম না থাকায় হাইব্রিড ও সুবিধাভোগী নেতাকর্মীদের অভয়ারণ্য ছিল আওয়ামী লীগের মধ্যে। দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে এইসব হাইব্রিড ও সুবিধাভোগী নেতাকর্মীরা এখন মামলা হামলার ভয়ে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। বিরূপ পরিবেশে আত্মশুদ্ধির মাঝে নিবেদিত প্রাণ দলীয় নেতাকর্মীরা যদি জনগণের মাঝে আস্থা সৃষ্টি করতে পারে তবে দল হিসেবে আবার ফিরে আসার সুযোগের সূচনা হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছে।
বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত অনেক দল সময়ের ব্যবধানে জনসমর্থনের কারনে আবার ফিরে এসেছেন। যেহেতু দেশে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক রয়েছে। তার যদি আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সময়ের ব্যবধানে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে আবার ফিরে আসে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা। ###

